২৪ মার্চ ২০২৬
preview
ইরান–ইসরায়েল উত্তেজনার প্রভাবে ভারতে এলপিজি সংকট, মেনু থেকে বাদ পড়ছে শিঙাড়া ও দোসা

NirobDhoni


হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারতে এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব এখন শুধু জ্বালানি খাতে নয়, দেশটির রেস্তোরাঁ ও স্ট্রিট ফুড ব্যবসাতেও পড়তে শুরু করেছে।

ভারতের বিভিন্ন শহরে অনেক খাবারের দোকান মেনু থেকে শিঙাড়া, দোসা বা বান-মাখনের মতো জনপ্রিয় আইটেম সাময়িকভাবে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ, বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে।

ভারত তার প্রয়োজনীয় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) প্রায় ৮৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ইরান–ইসরায়েল উত্তেজনার কারণে সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় সরকার এখন গৃহস্থালির ব্যবহারের জন্য গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এর ফলে ক্যানটিন, হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী বিকল্প হিসেবে ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করলেও ভারতীয় রান্নার স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

রাজস্থানের জয়পুরে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘গুলাবজি চা’-এর মালিক চেতন সিং জানান, এলপিজি সংকটের কারণে তাঁদের মেনু থেকে বান-মাখন ও শিঙাড়ার মতো খাবার বাদ দিতে হয়েছে। একইভাবে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের ‘বেনে দোসা’ রেস্তোরাঁর কর্ণধার অখিল আইয়ারও জানান, গ্যাসের মজুত শেষের দিকে চলে যাওয়ায় তাঁরা দোসা বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংকট মোকাবিলায় শোধনাগারগুলোতে এলপিজি উৎপাদন প্রায় ৩৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে মজুতদারি ও কালোবাজারি ঠেকাতে অভিযানে ১৫ হাজারের বেশি সিলিন্ডার জব্দ করা হয়েছে।

যুদ্ধের আঁচ পৌঁছাল রান্নাঘরে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল উত্তেজনার প্রভাব ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের আশঙ্কা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতের দৈনন্দিন জীবনেও।

বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভারত তার প্রয়োজনীয় এলপিজির বড় অংশই আমদানি করে। রান্নার জ্বালানি হিসেবে এই গ্যাস দেশটির প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের জন্য অপরিহার্য।

মেনু ছোট করছে রেস্তোরাঁ

সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় সরকার বাণিজ্যিক খাতের গ্যাস কমিয়ে গৃহস্থালি খাতে সরবরাহ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছে। এর ফলে ক্যানটিন, হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর রান্নাঘরে সংকট তৈরি হয়েছে।

জয়পুরের ‘গুলাবজি চা’ রেস্তোরাঁর মালিক চেতন সিং বলেন, এলপিজি সংকটের কারণে তাঁরা মেনু সীমিত করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “মানুষ সাধারণত এখানে এসে বান-মাখন আর শিঙাড়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়। এখন সেগুলো না পেয়ে অনেকে হতাশ হচ্ছেন।”

ইন্ডাকশন চুলা, কিন্তু স্বাদে ঘাটতি

কিছু রেস্তোরাঁ বিকল্প হিসেবে ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। তবে অনেক রাঁধুনির মতে, ভারতীয় রান্নার অনেক পদ উচ্চ তাপ ও সরাসরি আগুনের শিখার ওপর নির্ভরশীল।

কারি, তন্দুরি বা তেলে ভাজা খাবারের ক্ষেত্রে গ্যাসের আগুনের তাপ ও স্বাদ সহজে পাওয়া যায় না। ফলে শিঙাড়া ভাজার মতো খাবার ইন্ডাকশন চুলায় একই মানে তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এলপিজি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

অনেক রেস্তোরাঁ মেনু সীমিত করছে।

বিকল্প হিসেবে ইন্ডাকশন চুলার ব্যবহার বাড়ছে।

সংকট কতদিন স্থায়ী হবে?

বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে।

আগাম কেনাকাটার হিড়িক

সংকটের আশঙ্কায় অনেক মানুষ আগাম গ্যাস কেনার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন শহরে গ্যাস বিতরণকেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। একটি সিলিন্ডার পাওয়ার আশায় অনেকে ভোররাত থেকেই লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন ইন্ডিয়ায় ইন্ডাকশন চুলার বিক্রি গত সপ্তাহে ৩০ গুণের বেশি বেড়েছে।

মূল ধারণা: জ্বালানি সরবরাহে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা দ্রুতই স্থানীয় অর্থনীতি ও দৈনন্দিন খাদ্যব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে—ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি তার একটি উদাহরণ।

ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশও যখন জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন বৈশ্বিক সংঘাত বা সরবরাহ ব্যাঘাতের প্রভাব দ্রুত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এলপিজি সংকটের কারণে রেস্তোরাঁ ও স্ট্রিট ফুড ব্যবসায় চাপ তৈরি হওয়া তারই লক্ষণ।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং মজুতদারি ঠেকাতে অভিযান চালানো সংকট সামাল দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। গৃহস্থালির জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখানে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এসেছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সংকট খাদ্য ব্যবসায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়াতে পারে। যদিও ঐতিহ্যগত রান্নার পদ্ধতি ও স্বাদের কারণে তা সহজে বাস্তবায়নযোগ্য হবে কি না—সে প্রশ্নও রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতির অস্থিরতা যে শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং খাদ্যসংস্কৃতি ও ছোট ব্যবসার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে—ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাই সামনে আনছে।


এমডি রহমান

ফোন : +1 4647335595, ই-মেইল: protidhoni24@gmail.com